যুক্তরাজ্যে অভিবাসী কেয়ার কর্মীদের স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি (ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন-আইএলআর) পাওয়ার অপেক্ষার সময় ৫ বছর থেকে ১৫ বছরে বাড়ানোর সরকারি পরিকল্পনা দেশটির রাজনীতিতে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। শ্রমিক অধিকার সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন ও কেয়ার কর্মীরা এই পরিকল্পনাকে অমানবিক আখ্যা দিয়ে বিরোধিতা করছেন। একই সঙ্গে সরকারের অভ্যন্তরেও এ নিয়ে মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে।
যুক্তরাজ্যে অভিবাসী কেয়ার কর্মীদের স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি (Indefinite Leave to Remain-ILR) পাওয়ার অপেক্ষার সময় ৫ বছর থেকে ১৫ বছরে বাড়ানোর সরকারি পরিকল্পনা দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। সরকারের এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে শ্রমিক অধিকার সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন এবং অভিবাসী কেয়ার কর্মীরা তীব্র সমালোচনা করেছেন।
সরকারের নতুন অভিবাসন পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাধারণভাবে স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতা অর্জনের সময়সীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার প্রস্তাব রয়েছে। তবে স্বল্প ও মধ্যম দক্ষতার পেশায় কর্মরতদের জন্য, যার মধ্যে সামাজিক সেবা ও কেয়ার সেক্টরের কর্মীরাও রয়েছেন, এই সময়সীমা ১৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এদিকে হোম অফিসের মন্ত্রী মাইক ট্যাপ এই নীতির বিরোধিতা করে বলেছেন, কেয়ার কর্মীদের ক্ষেত্রে এই নতুন নিয়ম প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়। তার মতে, অভিবাসী কেয়ার কর্মীরা যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা খাত সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। তাই তাদের জন্য ব্যতিক্রম রাখা প্রয়োজন।
মাইক ট্যাপের এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে সরকারের অভ্যন্তরেও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের কাছে তাকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণের আহ্বান জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। পাশাপাশি সংবেদনশীল সরকারি নথি ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তার প্রবেশাধিকারও সীমিত করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সরকারের প্রস্তুতাধীন অভিবাসন নীতির তথ্য ফাঁস করেছিলেন।
শ্রমিক অধিকার সংগঠনগুলো মাইক ট্যাপের অবস্থানকে সমর্থন জানিয়েছে।
ওয়ার্ক রাইটস সেন্টারের প্রধান নির্বাহী ড. ডোরা-অলিভিয়া ভিকল বলেন, যুক্তরাজ্যের প্রয়োজনেই এসব মানুষ বৈধভাবে দেশটিতে এসেছেন। এখন নিয়ম পরিবর্তন করে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে দেওয়া শুধু নিষ্ঠুরই নয়, একটি লেবার সরকারের জন্যও অত্যন্ত বিবেকবর্জিত সিদ্ধান্ত। তিনি আরও বলেন, নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম দায়িত্ব নিলে এই পরিকল্পনা বাতিল করাই সবচেয়ে সঠিক পদক্ষেপ হবে।
অন্যদিকে ট্রেড ইউনিয়ন ইউনিসনের সামাজিক সেবা বিভাগের প্রধান গ্যাভিন এডওয়ার্ডস বলেন, যারা যুক্তরাজ্যের অত্যাবশ্যকীয় জনসেবা খাত সচল রেখেছেন, তাদের জন্য মাঝপথে নিয়ম পরিবর্তন করা মুখে চপেটাঘাতের সামিল।
তার মতে, বর্তমান স্পন্সরশিপভিত্তিক ভিসা ব্যবস্থার কারণে কেয়ার কর্মীরা নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এতে অনেক ক্ষেত্রে কম বেতন, অতিরিক্ত কাজ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বিভিন্ন ধরনের শ্রম শোষণের শিকার হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন পরিকল্পনা কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সেইসব কেয়ার কর্মীরা, যারা ইতোমধ্যে পাঁচ বছরের মেয়াদ পূরণের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন।
জোসেফিনের অভিজ্ঞতা
জিম্বাবুয়ে থেকে ২০২২ সালে যুক্তরাজ্যে আসা এক কেয়ার কর্মী (ছদ্মনাম জোসেফিন) জানান, চাকরির শুরুতে তাকে নিয়োগকর্তার বাড়ির বাগানের একটি কাঠের ঘরে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল। রাতে টয়লেটের পরিবর্তে একটি বালতি ব্যবহার করতে হতো এবং গোসলের জন্যও সীমিত পরিমাণ পানি দেওয়া হতো।
তিনি জানান, যুক্তরাজ্যে আসতে নিজের মূল্যবান সম্পদ বিক্রি করতে হয়েছে এবং আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। চাকরি হারানোর আশঙ্কায় দীর্ঘদিন তিনি কোনো অভিযোগও করতে পারেননি।
বর্তমানে তার আইএলআর পাওয়ার আর মাত্র ১০ মাস বাকি। তবে নতুন পরিকল্পনা কার্যকর হলে তাকে আরও পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তার ভাষায়,
"আমি আমার কাজকে ভালোবাসি। সমাজের জন্য অবদান রাখতে চাই। কিন্তু এখন আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় ভুগছি।"
কার্লার অভিজ্ঞতা
নাইজেরিয়া থেকে ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যে আসা আরেক কেয়ার কর্মী (ছদ্মনাম কার্লা) জানান, অনেক সময় তিনি টানা এক মাসও কোনো ছুটি ছাড়াই কাজ করেছেন।
তিনি বলেন, প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে নিজের কিশোরী মেয়ের সঙ্গে সময় কাটানোরও সুযোগ পান না।
তার অভিযোগ, অতিরিক্ত কাজের চাপে শারীরিকভাবে ভেঙে পড়লেও ভিসার শর্তের কারণে প্রতিবাদ করার সাহস পান না। কারণ চাকরি হারালে যুক্তরাজ্যে থাকার সুযোগও হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
কার্লার মতে, নতুন পরিকল্পনা কার্যকর হলে তাকে আরও দীর্ঘ সময় একই অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হবে, যা তিনি অমানবিক বলে মনে করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাজ্যের কেয়ার খাত বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল। এমন পরিস্থিতিতে আইএলআর পাওয়ার সময়সীমা ১৫ বছরে উন্নীত করা হলে নতুন কর্মী আকর্ষণ কঠিন হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে বর্তমানে কর্মরত হাজারো অভিবাসী কেয়ার কর্মীর মধ্যে অনিশ্চয়তা ও অসন্তোষ আরও বাড়বে।
ফলে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের সরকারি লক্ষ্য এবং স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা খাতের জনবল সংকট—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনলাইন ডেস্ক
Comments: