০৬ জুন ২০২৬ | ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বাংলাদেশ
সড়কজুড়ে ধান মাড়াই ও খড় শুকানো: দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে গ্রামীণ জনপদে

image

নওগাঁ জেলার বিভিন্ন উপজেলার গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়কগুলো এখন আর শুধু যানবাহন চলাচলের পথ নয়, অনেক ক্ষেত্রে তা পরিণত হয়েছে অস্থায়ী ধান মাড়াই কেন্দ্র ও শস্য শুকানোর মাঠে। সড়কের ওপর ধান শুকানো, মাড়াই করা, খড় ছড়িয়ে রাখা কিংবা রাস্তার পাশে বিশাল আকারের খড়ের স্তূপ তৈরির দৃশ্য এখন জেলার প্রায় প্রতিটি উপজেলাতেই চোখে পড়ে। বিশেষ করে চলতি মৌসুমে প্রতিকূল আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি এবং পর্যাপ্ত খোলা জায়গার অভাবে কৃষকদের বড় একটি অংশ সড়ককেই বেছে নিয়েছেন ফসল সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজের জন্য।

তবে কৃষকের এই বাস্তবতা যেমন আছে, তেমনি রয়েছে সড়ক নিরাপত্তার বড় প্রশ্নও। কারণ কৃষি কাজের সুবিধার্থে সড়ক ব্যবহারের ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। ইতোমধ্যে ঘটেছে প্রাণহানির ঘটনাও। ফলে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- সড়ক দখল করে ধান মাড়াই ও খড় শুকানোর কারণে যদি দুর্ঘটনা ঘটে, তবে এর দায় কার?

সম্প্রতি নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলায় ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এনেছে বিষয়টি। গত ১ জুন রাত আনুমানিক ৯টার দিকে ধামইরহাট-নজিপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের বিহারিনগর এলাকায় সড়কের ওপর শুকানো খড় ও রাস্তার পাশে রাখা খড়ের স্তূপের কারণে মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রাণ হারান আজিজার রহমান (৩৬) নামে এক যুবক। গুরুতর আহত হন তার পিতা নুরুজ্জামান (৬০)।

স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাতে মোটরসাইকেলে করে বাড়ি ফেরার পথে সড়কের ওপর ছড়িয়ে থাকা খড়ের কারণে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে যায়। মোটরসাইকেলটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে রাখা খড়ের স্তূপে ধাক্কা দেয়। এতে পিতা-পুত্র দুজনই সড়কে পড়ে গেলে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ড্রাম ট্রাক আজিজার রহমানকে চাপা দেয়। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

এ দুর্ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই ওই এলাকায় রাস্তার ওপর ধান ও খড় শুকানোর প্রবণতা ছিল। কিন্তু কার্যকর নজরদারির অভাবে তা বন্ধ হয়নি।

সরেজমিনে পত্নীতলা ও ধামইরহাট উপজেলার ফতেপুর থেকে মাতাজিহাট আঞ্চলিক সড়ক ঘুরে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন স্থানে ধান মাড়াই, ধান শুকানো এবং খড় শুকানোর কাজ চলছে। কোথাও সড়কের একপাশ পুরোপুরি দখল হয়ে গেছে, আবার কোথাও রাস্তার দুই পাশজুড়ে খড়ের স্তূপ রাখা হয়েছে। অনেক স্থানে ধান ও খড়ের আবরণে পিচঢালা রাস্তার মূল অংশ প্রায় আড়াল হয়ে গেছে।

সড়ক ব্যবহারকারী স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দিনের বেলায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও সন্ধ্যা কিংবা রাতের বেলায় বিপদ আরও বেড়ে যায়। দূর থেকে রাস্তার ওপর ধান বা খড় আছে কি না, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। মোটরসাইকেল, ইজিবাইক কিংবা সাইকেল আরোহীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।


তবে কৃষকদের অবস্থানও পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। এবারের মৌসুমে বারবার বৃষ্টি, আকাশে মেঘলা আবহাওয়া এবং আবহাওয়ার অনিশ্চয়তার কারণে ফসল দ্রুত ঘরে তোলার চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক কৃষক জানান, ধান কাটার পর সামান্য সময়ের মধ্যেই বৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। ফলে ধান শুকানোর জন্য অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বাড়ির উঠান ছোট হওয়া, পর্যাপ্ত খোলা জায়গার অভাব এবং বিকল্প শুকানোর মাঠ না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে সড়কের আশ্রয় নিচ্ছেন।

বড়থা বাজার এলাকার এক কৃষক বলেন, “সারাদিন কষ্ট করে ধান কাটার পর যদি বৃষ্টিতে ভিজে যায়, তাহলে বড় ক্ষতি হয়। গ্রামের অনেক বাড়িতেই বড় উঠান নেই। তাই বাধ্য হয়ে রাস্তার ওপর ধান শুকাতে হয়।”

মাতাজিহাট এলাকার আরেক কৃষক জানান, “আমরা ইচ্ছা করে রাস্তা দখল করি না। আবহাওয়া ভালো থাকলে মাঠ বা বাড়ির উঠানে কাজ করা যায়। কিন্তু এ বছর বৃষ্টি আর মেঘের কারণে দ্রুত শুকানোর জন্য রাস্তার গরম পিচের ওপর ধান ছড়িয়ে দিতে হচ্ছে।”


কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পিচঢালা সড়ক সূর্যের তাপ দ্রুত ধারণ করে। ফলে ধান ও খড় তুলনামূলক দ্রুত শুকিয়ে যায়। এ কারণেও কৃষকরা সড়ককে বেশি উপযোগী মনে করেন। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি।

সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, রাস্তার ওপর ধান, খড় বা তুষ ছড়িয়ে রাখলে যানবাহনের চাকার সঙ্গে রাস্তার ঘর্ষণ কমে যায়। বিশেষ করে মোটরসাইকেল সহজেই পিছলে যেতে পারে। এছাড়া রাস্তার পাশে বড় বড় খড়ের গাদা থাকলে বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহন কিংবা পথচারীকে সময়মতো দেখা যায় না। এতে সংঘর্ষের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, শুধুমাত্র কৃষকদের দোষারোপ করে সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ সমস্যার পেছনে রয়েছে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। প্রতিটি ইউনিয়নে যদি নির্দিষ্ট শস্য শুকানোর স্থান, কমিউনিটি ড্রাইং ইয়ার্ড কিংবা কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র থাকত, তাহলে কৃষকদের সড়কে নামতে হতো না।

তাদের মতে, একদিকে কৃষকের ফসল রক্ষার সংগ্রাম, অন্যদিকে মানুষের নিরাপদ চলাচলের অধিকার- দুই বিষয়কেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

ধামইরহাটের বিহারিনগরে আজিজার রহমানের মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কৃষকরা সড়ককে কর্মক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন, কিন্তু সেই বাস্তবতা যেন আর কোনো পরিবারের জন্য শোকের কারণ না হয়। কৃষকের প্রয়োজন ও সড়ক নিরাপত্তার মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। তা না হলে সড়কের ওপর ছড়িয়ে থাকা ধান-খড়ের স্তূপ আরও কত প্রাণ কেড়ে নেবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাবে।













মো. এ কে নোমান

ভিডিও
Comments:
Sponsered Ad
Advertisement Advertisement Advertisement Advertisement Advertisement Advertisement Advertisement Advertisement

loading